এক তরুণ বাঙালীর চোখে দেখা ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ

 

PIC 1- 974 Stadium এর ভেতরে

“Fifa Worldcup” যাকে নিঃসন্দেহে বলা যায় “The greatest Show on earth”. আমাদের দেশ cricket প্রধান দেশ হলেও প্রতি ফিফা বিশ্বকাপ এর সময়ে আমাদের দেশের মানুষের ফুটবল এর প্রতি ভালোবাসা সকল দেশকে পিছনে ফেলে দেয়। যদিও আমাদের দেশ বিশ্বকাপে খেলতে পারেনা তার পর ও বিশ্বকাপের সময় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার অন্ধ ভক্তরা জেগে ওঠেন। পুরো দেশ যেন দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। যেই দেশ দুটি আমাদের থেকে প্রায় ১৫,৯১৫ কিঃমিঃ দূরে অবস্থিত এবং আমাদের দেশের সাথে তেমন কোন কূটনীতিক সম্পর্কও নেই, সেই দেশের পতাকা নিয়ে আমরা পথে নেমে যাই, বাসার ছাদে টানাই। এতোটাই শক্তি এই ফুটবলের। সুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বের প্রায় সব দেশেরই একই অবস্থা। আমার সুযোগ হয়েছিল এবার এর ফুটবল বিশ্বকাপ, FIFA WORLDCUP 2022 QATAR, সশরীররে কাতার এ গিয়ে দেখার।

FIFA (Fédération Internationale de Football Association) এর জন্ম হয়েছে এখন থেকে ১১৮ বছর (১৯০৪ সালে) পূর্বে। এখন পর্যন্ত ফিফা ২২টি ফুটবল বিশ্বকাপ (ছেলেদের) সফল ভাবে আয়োজন করেছে বিভিন্ন দেশে । প্রথম বিশ্বকাপটি হয়েছিল ১৯৩০ সালে। এ পর্যন্ত সবথেকে বেশি বিশ্বকাপ ট্রফি জিতেছে ব্রাজিল দল (৫ বার) এবং তারাই একমাত্র দল যারা সব গুলো বিশ্বকাপ খেলতে পেরেছে ।

কিন্তু এবারের বিশ্বকাপটি ছিল বিগত সকল বিশ্বকাপ থেকে অনেক আলাদা। কারন গুল হলোঃ

১. এটি কোন আরব দেশে হওয়া প্রথম বিশ্বকাপ এবং এশিয়াতে দ্বিতীয় ।

২. এটি প্রথম কোন বিশ্বকাপ যেটা গ্রীষ্মকালে না হয়ে শীতকালে করা হয়।

৩. কাতার বিশ্বকাপ এর বাজেট ছিল অন্য সকল বিশ্বকাপের থেকে কয়েক গুন বেশি। প্রায় ২২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ছিলো ১৫ বিলিয়ন - ব্রাজিল ২০১৪)

৪. এই প্রথম কোন বিশ্বকাপের স্টেডিয়ামে এলকোহল বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল।

PIC 2- Qatar WorldCup 2022 Mascot “ La'eeb “

৫. এই প্রথম কোন বিশ্বকাপ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু করা হয় কোরআন শরীফ তেলোয়াতের মাধ্যমে।

৬. এই বিশ্বকাপে সবথেকে আধুনিক Video Assistant Referee (VAR) প্রযুক্তির সাথে নতুন সংযোজন করা হয় Semi -automated Offside Technology

PIC 3- At Ahmed bin Ali Stadium

আমার বিশ্বকাপের প্রতি ভালোবাসা শুরু হয় ১৯৯৮ সালে ব্রাজিলের রোনালদোর খেলা দেখে । ১৯৯৮ সালের ফাইনালে ব্রাজিলকে ফ্রান্স এর কাছে হারতে দেখে যতটা কষ্ট পেয়েছিলাম, তার থেকেও বেশী আনন্দ পেয়াছিলাম ২০০২ এ রোনালদোর হাতে বিশ্বকাপ দেখে। তখন থেকেই আমার ফুটবলে ব্রাজিল দলকে ভালোবাসা। সেই ছোট্টবেলার আমি স্বপ্ন দেখতাম একদিন আমিও মাঠে বসে আমার প্রিয় দলের খেলা দেখব। যখন শুনতে পেলাম ২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপ হবে, তখনই মনে মনে সিদ্ধান্ত নেই যে আমি বিশ্বকাপ দেখতে যাবো। কাতারকে বাছাই করার পিছনে একটা বিশেষ কারন হল, আমার অনেক আত্মীয় কাতারে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে থাকেন । তাদের কাছে কাতার এর অনেক গল্প শুনেছি এবং যাওয়ার অনের ইচ্ছা ছিল। তাই এই বছর জানুয়ারি মাসে যখনই প্রথম অনলাইনে টিকেট ছাড়া হয় আমি সাথে সাথে খেলার টিকেট, প্লেনের টিকেট এবং হোটেল বুকিং দিয়ে Hayya Card এর জন্য Apply করে ফেলি। এর পর শুরু হয় কাতার বিশ্বকাপ নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের নানা নেতিবাচক খবর, যা দেখে মনে হচ্ছিল এবারের বিশ্বকাপটি খুব বেশী সফল হবে না। অনেক খবর এ তো এটাও শোনা যাচ্ছিল যে, না ও হতে পারে বিশ্বকাপ। এসব দেখে অনেকেই তাদের টিকিট বাতিল করছিল। কিন্তু আমি দৃঢ় ছিলাম যে, যাই হক না কেন, আমি যাবোই। এবং এটা আমার জীবনের নেয়া একটি সেরা সিদ্ধান্ত ছিল।

PIC 4- কাতার এর জাতীয় পোশাক  “থোব”

জুন মাসের ৬ তারিখ আমার বাসায় কাতার থেকে একটি পার্সেল আশে। খুলে দেখি কাতার এর “HAYYA Card”. “HAYYA” একটি আরবি শব্দ , যার আর্থ “স্বাগতম বা Welcome” । “HAYYA Card” হচ্ছে বিশ্বকাপের সময় কাতারে ঢুকার পারমিট বা ভিসা। সুধু তাই না, এটা থাকলে কাতারে মেট্রোরেল এবং বাসে যতবার খুশি তত বার ভ্রমণ করা বিনামূল্লে যাবে। তা ছাড়া কাতারের কিছু দর্শনীয় স্থান যেমন ফিফা ফেন ফেস্টিভাল, সমুদ্রবন্দর, কাতারা বীচ ইত্যাদি তে প্রবেশ করা যাবে। এই Hayya Card দিয়ে কাতারে বিনামূল্লে ২টা কম্পানির (১টি করে) সিম নেয়া যায় যেটায় ২দিনের জন্য Unlimited টকটাইম এবং ডাঁটা ছিল। এ বিষয়টা কাতার সরকারের একটি ভালো সিদ্ধান্ত ছিল কারন কাতার এ ইন্টারনেটের দাম অতিরিক্ত। কাতার এ চার জিবি ডাটার মূল ১৮০০ টাকা। তা ছাড়া বিশ্বকাপ এর নানা ফ্রি গিফট পাওয়া থেকে শুরু করে গাড়ি ভাড়া নিতেও এই Card ব্যবহার করতে হয়েছে। এক কথায় এই সময় Hayya Card ই ছিল ভিজিটরদের পরিচয় পত্র । এই Card এর মাধ্যমে কাতারে আগত দর্শকরা অনেক সুবিধা বিনামূল্লে উপভোগ করতে পেরেছে।

আমি যখন বিমানের টিকিট কেটেছিলাম তখন বাংলাদের বিমান ছাড়া অন্য কোন বিমানের এত আগে সিডিউল ছিল না, তাই অনেকটা বাধ্য হয়ে টিকিট কাটতে হয়। আমার যাওয়ার টিকিট ছিল ২৩ নভেম্বর আর ফেরার টিকিট ছিল ৭ ডিসেম্বর। এই ১৫ দিন আমার জীবনের সব থেকে আনন্দময় দিন ছিল।

কিন্তু আমার ভ্রমণের শুরুটা খুব একটা ভালো ছিল না। ২৩ নভেম্বর দুপুরে আমি দোহার উদ্দেশ্যে রউনা দেই। আমার টিকিট ছিল বাংলাদেশ বিমানের Boing 787 বিমানে, কিন্তু যাবার পর যানতে পারলাম যে আমাদের যেতে হবে Boing 737 বিমানে। যেটার মান খুবই খারাপ। ৬ ঘণ্টার বিমান ভ্রমন খুব একটা ভালো কাটে নি যেহেতু বিমানটি ভালো ছিল না। তা ছাড়া আমাদের দেশের ইমিগ্রেসন এ অনেক সময় নিয়েছে তারা । অনেকের কাছে অপ্রয়োজনীয় কাগজ চেয়ে হয়রানী করছিল । আমাকে টানা ২.৫ ঘণ্টা লাইনে দারিয়ে থাকতে হয়েছে, কোন কারন ছাড়াই। বাংলাদেশ বিমানের খাবার থেকে শুরু করে বিমানবালাদের ব্যাবহার, সব কিছু খুবই বাজে ছিল । বাংলাদেশ পার হয়ে কাতার বিমান বন্দরে নামার পর সব অভিজ্ঞতা পরিবর্ত হয়ে গেল । বাংলাদেশে যেখানে আমার ইমিগ্রেসন আর চাকিং এ ৩ ঘণ্টা লেগেছিল সেখানে কাতারে মাত্র ২০ মিনিতে আমি ব্যাগ ও হাতে পেয়ে যাই।

 

PIC 5একাত্তর টেলিভিশন এর সাথে সাক্ষাৎকার

 

PIC 6- ইরান এর সমর্থকদের সাথে - AL Tumama

PIC 7- Flag Plaza QATAR

কাতার এর “হামাদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট” যেন নিজেই একটা শহর । বিশ্বর বৃহত্তম বিমানবন্দরের মধ্যে একটি । এখানে বিসাল হোটেল, মার্কেট, লঞ্জ এমনকি একটি পার্ক ও রয়েছে । এই বিমানবন্দরে চলাচলের জন্য নিজস্ব ও মেট্রোরেল রয়েছে। বিশ্বকাপের জন্য পুরো বিমানবন্দরকে বর্ণিল রঙ্গয়ে সাজানো হয়েছে । এত অপরূপ দৃশ্য দেখার পর আমার ভ্রমণের সকল ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। তাছাড়া সম্পূর্ণ বিমানবন্দরে ওইফাই ফ্রি ছিল এবং বের হওয়ার সময় সবাইকে তারা একটি ওয়েলকাম বক্স দিয়েছে যেটায় কাতার এর মানচিত্র, লোকেশান গাইড, হোটেল গাইড সহ আরো অনেক প্রয়োজনীয় জিনিশ ছিল। আমি বের হওয়ার আগে ফ্রি সিম কালেক্ট করে নিয়ে আমার মামার গাড়িতে হোটেল এর দিকে রওনা হোই।

PIC 8- কাতার এর মেট্রোরেল এর ভিতরে

কাতার বিশ্বকাপ আয়জনের ঘোষণা পাওয়ার পর তাদের একটাই লক্ষ ছিল, বিশ্বকে ইতিহাসের সব থেকে সফল বিশ্বকাপ উপহার দেয়া। এই লক্ষে তারা পুরো দেশটাকে নতুন রুপে সাজিয়েছে। তাদের এই উদ্দ্যগ এবং সফলতা দেখে পুরো বিশ্ব অবাক হয়ে ছিল। প্রথমেই বলতে হয় তাদের বিশ্বকাপ উপলক্ষে তৈরি করা ৮টি স্টেডিয়াম এর কথা। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল সব কয়টি স্টেডিয়াম দেখার। এগুলো সুধু স্টেডিয়াম নয়, এক একটি শৈল্পিক স্থাপনা যা পৃথিবীতে বিরল । এক একটি স্টেডিয়াম এর ডিজাইন এক এক বিশেষত্ব প্রকাশ করে। যেমন, ৯৭৪ নামের স্টেডিয়ামটি তৈরি করা হয়েছে ৯৭৮ টি শিপিং কন্টেইনার দিয়ে। সব থেকে বড় স্টেডিয়াম লুসেইল এর আকৃতি দেয়া হয়েছে খেজুরের বাটির মত । উদ্ভোদনি অনুষ্ঠান যেই স্টেডিয়াম এ হয়েছে (আল-বাইত স্টেডিয়াম) সেটার আকৃতি ছিল মরুভূমিতে থাকা তাঁবুর মত । তাছাড়া,  সব স্টেডিয়াম গুলোর দূরত্ব এমন ছিলো যে, মেট্রো দিয়ে এক দিনেই সব গুলো স্টেডিয়াম এ যাওয়া সম্ভব। এর পরই বলতে হয় ওদের মেট্রোরেল এর কথা। এটি আমাদের জন্য ছিল একটি আশীর্বাদ সরূপ। বিগত সকল বিশ্বকাপে যাতায়াত ব্যবস্থা নিয়ে অনেক সমালচনার শিকার হতে হয়েছে আয়োজক দেশেগুলোর। ভাড়া বেশী, চুরি-ডাকাতি, ভুল দিকে নিয়া যাওয়া সহ কতো না অভিযোগ ছিল খেলা দেখতে আসা দর্শকদের। কিন্তু কাতার সরকার এত সুন্দর পরিকল্পনা করে মাটির নিচে দিয়ে এই রেল তৈরি করেছেন যে এটি দিয়ে কাতার এর প্রায় সব যায়গাই যাওয়া সম্ভব, এবং এটা ছিল আমাদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আর প্রতিটা মেট্রো  স্টেশন ও ছিল দেখার মত সুন্দর।

PIC 9- Pearl Qatar

PIC 10- Farkeh Beach (Al Khor)

আমি যেই কাতার দেখেছি সেটা যদি এক কথায় যদি বলি, “একটি পরিষ্কার-পরিছন্ন, নিরাপদ, গতিময়, সুপরিকল্পিত, অত্তাধনিক শহর” । আরব সাগরের বুকে ছোট্ট একটি দেশ কাতার। এর মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩০ লক্ষ। এর মধ্যে শুধুমাত্র ১৫% কাতারের নাগরিক বাকিরা সবাই অন্য দেশের নাগরিক। দেশটি তে ভারতীয়দের সংখ্যা সর্বোচ্চ, প্রায় ২৪% । আর বাংলাদেশীদের সংখ্যা ৫% । কাতারকে যদি একটি বৃত চিন্তা করি তবে বৃতের চারিদিকে সমুদ্র, সমুদ্রকে ঘীরে রয়েছে বিশাল মরুভূমি আর এর পর অত্তাধনিক ও নান্দনিক শহর। আমাদের দেশের মত টানা এত বড় সমুদ্র সৈকত না থাকলেও অনের ছোট ছোট সৈকত রয়েছে এর চারপাশে। তারা প্রতিটা সৈকতকে সাজিয়েছে ভিন্ন ভিন্ন রঙে। যেমন, কাতারা নামে যেই সমুদ্র সৈকতটি রয়েছে, সেখানে তারা তাদের পূর্বের ঐতিহ্যকে (জেলে) তুলে ধরেছে । তাদের পূর্বপুরুষের মাছ ধরার নৌকা, জাল, পোশাক ইত্যাদি বিষয় গুলো প্রদর্শন করা হয়। এ যেন সাগর পারে একটি জীবন্ত যাদুঘর । এছারাও আমার সি লাইন বীচ, আল-খোর বীচ, সী পোর্ট বীচ, করনিস বীচ ও লুসেইল বীচ এ যাবার সৌভাগ্য হয়েছে । সমুদ্র পার গুলতে আছে নানা ওয়াটার স্পোর্টস এর ব্যবস্থা । কাতাররের চারপাশে রয়েছে মরুভূমী । মরুভূমি হলেও সেখানে করার মত ও দেখার মত অনেক কিছু ছিল। সেখনে ছিল গাড়ি ভাড়া করে মরুভূমিতে সাফারি করার ব্যবস্থা । তাছাড়া মরুর বুকে উটের পিঠে চরে বেড়ানর ব্যবস্থাতো আছেই ।

কাতার শহরের কথা বললে বলতে হয় এর প্রতিটি প্রান্তই নান্দনিক । কাতার এর “Lusail City” এর কথা না বললেই নয় কারন এটি হচ্ছে পৃথিবীর সবথেকে আধুনিকতম শহর যেটা এই কয়েক বছর আগেও ছিল সুধুই মরু ভূমী । তাছাড়া কাতারতের বিখ্যাতো “পার্ল কাতার” এর নাম তো সবাই শুনেছেন। পুরো কাতার জুড়ে রয়েছে সবুজে মোড়ানো পার্ক । পার্ক গুলোর গাছের সমাহার দেখে মনেই হয় না যে এটা কোন মরুভূমির দেশ । কাতারতের প্রতিটি রাস্তা, বাণিজ্যিক এবং আবাসিক এলাকা সবুজ সবুজ গাছ ও ফুলে মোড়ানো । মরুর বুকে এত গাছ কিভাবে এলো ! এ যেন অবাক করা বিষয় । সূর্যের তাপ থেকে পথচারীদের আরাম দিতে কিছু স্থানে রাস্তায় ও কুলার এর ব্যবস্থা করে রেখেছেন তারা । কাতারের কিছু শপিং মল রয়েছে যা এক একটা বিশ্বয়। যেমন ভিলাজিও নামের শপিং মলের ভিতরে রয়েছে একটি বিসাল লেক যেখানে আপনি চাইলে ইলেকট্রিক বোটে করে ঘুরতে পারবেন । ভেন্ডম মল দেখে মনে হবে একটি বিশাল রাজপ্রাসাদ যেখানে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিউজিক্যাল ওয়াটার ফাউন্টেন । কাতার মল এ রয়েছে পৃথিবীর সবচে বড় ৩৬০ ডিগ্রি এল ই ডি স্ক্রিন । এত আধুনিক মলের মধ্যেও কাতার তাদের পূর্বের ঐতিহ্য সংরক্ষিত রেখেছে ওল্ড সুক মার্কেটে । শহরের রাস্তা গুলো অনেক প্রসস্থ ও যানজট মুক্ত । এখানে ট্রাফিক আইন খুবই শক্ত । আপনি যদি এখানে ট্রাফিক লাইট অমান্য করেন তবে আপনাকে গুনতে হবে বাংলাদেশী টাকায়

PIC 11- ব্রাজিলের সমর্থকদের সাথে

প্রায় ২ লক্ষ টাকা জরিমানা । রাস্তায় কোন আবর্জনা ফেললে এমন কি নির্ধারিত স্থান ব্যতীত থু থু ফেললে ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা । এবং সেটা সাথে সাথে আপনার মোবাইল এপ এ চলে আসবে ছবি সহ । এত জরিমানা দেখে অনেকে বলেন, তেল এর পরই এইসব জরিমানা হল কাতার সরকারের ২য় উপার্জনের উৎস । আর এত জরিমানার কারনেই হয়ত সেখানে মানুষ সব নিয়ম মেনে চলে ।

PIC 12- ইংল্যান্ড এর এক ভক্তর সাথে

এই বিশ্বকাপে সব থেকে বেশি আলোচিত হয়েছে যেই বিষয়টা সেটা হল কাতারের মানুষদের আতিথেয়তা । কাতারের নাগরিকরা প্রতিদিন তাদের বাসার বাইরে তাবু করে বিনামূল্যে পথচারীদের আপ্যায়ন করেছে নানা সুস্যাদু খাবার দিয়ে । কাতার এর নিজস্ব কিছু কড়াকড়ি নিয়ম কানুন ছিল। যেমন মেয়েদের পোশাকে বাধ্যবাধকতা, রাস্তার কিছু নিয়ম কানুন, মাস্ক পরা ইত্যাদি । কিন্তু এই বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে তারা আগত দর্শকদের জন্য অনেক কিছু সিথিল করে দিয়েছে । যেমন আমি সেখানের লাইসেন্স ছাড়াই শুধু বাংলাদেশের লাইসেন্স ও HAYYA Card দিয়েই গাড়ি ভাড়া করে চালাতে পেড়েছি । যেখানে অন্য সময় সে দেশে লাইসেন্স বিহীন গাড়ি চালানর জরিমানা বাংলাদেশী টাকায় ৩ লক্ষ টাকা । দেশটি তে কথাও মাস্ক পরার বাধ্যবাধকতা ছিল না যেখানে নভেম্বর মাসের সুরুতেও মাস্ক না পরার জরিমানা ছিল ৫০ হাজার টাকা । কাতার দর্শনার্থীদের কথা চিন্তা করে যত টুকু সম্ভব ছাড় এবং সুযোগ করে দিয়েছে ।

PIC 13- চারিদিকে শুধু মরুভূমি

PIC 14- হাতের মুঠয় বিশ্বকাপ

PIC 15- Lusail Staduium এর সামনে

কাতার বিশ্বকাপে আমার ৬টি খেলা দেখার সুযোগ হয়। ৫টি গ্রুপ পর্বের আর একটি নকআউট পর্বের । খেলার দিন গুলোতে হোটেল থেকে বের হয়ার পর থেকেই থাকত চরম উত্তেজনা । বিশেষ করে ব্রাজিলের খেলার দিন গুলোর ছিল অভাবনীয় । হাজার হাজার ব্রাজিল সমর্থক একত্রে মেট্রোতে করে গান গেতে গেতে, স্লোগান দিতে দিতে যাওয়ার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। ভিন্ন দেশের নানান রকমের মানুশ এক সাথে একই খেলা দেখতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল অভূতপূর্ব । এক কথায় এমন আমজে বিশ্বকাপ ছাড়া আর কথাও পাওয়া সম্ভব না । আমি প্রতিটি ম্যাচে আমার দেশের পতাকা সাথে নিয়ে গিয়েছি । আমার পতাকা দেখে সবাই চিনতে পেরেছে যে আমি বাংলাদেশী, কাউকে চিনাতে হয়নি । এটা আমার জন্য গর্বের বিষয় ছিল। কাতার সরকার স্টেডিউম গুলোতে ডোকা এবং বের হবার ব্যবস্থা এত সুন্দর ভাবে করেছেন যে ৮০ হাজার দর্শককে সামান্য তম সমস্যা হয়নি । নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোন ত্রুটি ছিলো না। যেখানে একজন নিরাপত্তা কর্মী হলেই চলতো, সেখানে তারা ৩ জন দিয়েছেন। খেলার দিন সেই নির্দিষ্ট স্টেডিউম এর বাইরে থাকত নানা বিন্দনের ব্যবস্থা। ওপেন এয়ার কন্সার্ট, ফেস পয়েন্টিং, ম্যাজিক সো সহ আরও অনেক কিছু । আর মাঠে খেলা দেখার অনুভুতি আসলে লিখে প্রকাশ করা যাবে না । এতদিন যেই দলের খেলা টেলিভিশনে দেখতাম তাদের খেলা নিজের চোখে দেখতে পেরে নিজের জীবন কে ধন্য মনে হচ্ছিল । আমি যেমন ব্রাজিল, ক্যামেরুনের সাথে হারার পর মন খারাপ করে চলে গিয়েছি ঠিক একই ভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে ৪ গোল দেয়া টান টান উত্তেজনার ম্যচ ও চরম ভাবে উপভোগ করেছি । নানা দেশের নানা বর্ণের মানুষে ওই মাঠে গিয়ে সবাই ব্রাজিল হয়ে যাই । সবাই তাদের জয় কামনা করি, স্লোগান দেই । তখন মনে হচ্ছিলো কবে আমাদের দেশ ও বিশ্বকাপ খেলবে আর সবাই আমাদের দেশের নামে স্লোগান দিবে । আমি সব স্টেডিয়াম এ ভ্রমণ করতে গেলেও শুধু মাত্র ৫টায় খেলা দেখার সুজোগ হয়েছে ।

PIC 16- Desert Safari

খেলা দেখা ছাড়াও এই বিশ্বকাপের একটি বড় আকর্ষণ ছিল FIFA Fan Fest । আসলে ফিফা বিশ্বকাপ ব্যতীত এত দেশের মানুষ একসাথে কথাও দেখা যায় না । Fan Fest ছিল সব দেশের সমর্থকদের মিলন মেলা । এখানের বিশাল স্ক্রিনে সবাই একসাথে খেলা দেখার মজা স্টেডিউম থেকে কোন অংশেই কম নয় । এটি সাগরের পারে হওয়ায় পরিবেশটা ও ছিল বেশ মনোরম। এখানে প্রতিদিন কনসার্ট, ডিজে পার্টি, গেইম জোন ইত্যাদি হত। আমি এখানে নোরা ফাতেহির কন্সার্টটি সহ আরও অনেক জনকপ্রিয় শিল্পীর কনসার্ট উপভোগ করেছিলাম । এছারাও ফ্যান ভিলেজে ২ দিন ছিলাম, যেখানে আমার বিভিন্ন দেশের মানুষের সাথে বন্ধুত্ত হয়েছে । যদিও থাকার জায়গাটা দাম অনুযায়ী বিশেষ ভালো ছিলনা তবে প্রতি রাতের বেলা সবার সাথে সাগর পারের বার বি কিউ করা আর খেলা দেখার স্মৃতি আমার সারাজীবন মনে থাকবে । এছাড়াও পুরো দেশটির বিভিন্ন স্থানে Fan Zone করা হয়েছিল যেখানে বড় স্ক্রিনে বিন ব্যাগে বসে খেলা উপভোগ করার পাশাপাশি আরো অনেক আয়োজন ছিল ।

PIC 17- Lusail City

PIC 18- Sukh Waqif

PIC 19- Afgani & Qatari Food

কাতার এর খাবার, থাকার ব্যবস্থা ও কেনাকাটার কথা না বলেরই নয় । কাতারে খাবর এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দিক দিয়ে ভারতীরা অনের এগিয়ে। এছাড়াও এখানে প্রচুর পাকিস্থানি, আফগান, লেবানিস, তুরকী, ইরানি ও কিছু বাংলা খাবারের দোকান রয়েছে । আমি সব রকমের দোকান এ খেয়াছি কিন্তু আমার কাছে আফগান খাবার বেশি ভালো লেগেছে । এখানের রেস্টুরেন্ট গুলো উক্ত দেশের মত করে সাজানো থাকে এবং শুধু সেই দেশী খাবারই পাওয়া যায়। তাছাড়া ইন্টারন্যাশনাল ব্রান্ড যেমন KFC, McDonnells, Pizza Hut ইত্যাদি তো আছেই । এখানে খাবারের মান অনুযায়ী দাম আমাদের দেশ থেকে কমই মনে হয়েছে আমার কাছে । তাছাড়া অনেক রিলেটিভ থাকার কারনে বিভিন্ন বাসায় দাওয়াতে ওখানের স্পেশাল অনেক খাবার খওয়ার সৌভাগ্য হয় আমার। কাতারে থাকার হোটেল এর মান অনেক ভালো। বিশ্বকাপের জন্য ভাড়া একটু বেশি ছিল, কিন্তু সহনীয় ছিলো। জামাকাপড়, পারফিউম, ইলেক্ট্রনিক্স সহ নিত্যপ্রয়োজনিও জিনিসের দাম আমাদের দেশের থেকে তুলনামূলক ভাবে কমই মনে হয়েছে আমার কাছে । এই সুযোগে পরিবারের সকলের জন্য অনেক উপহার নিয়ে নেই আমি।

কাতার এর চিকিৎসা বেবস্থা পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম। এখানের হাসপাতাল গুলোর মান অন্যান্ন উন্নত দেশ গুলোর হাসপাতাল থেকে মোটেও কম না। কিছু কিছু দিক থেকে অনেক উন্নত দেশ থেকেও ভালো। এক এক টা হাসপাতাল এর ডিজাইন এক এক রকম । হাসপাতাল গুলকে তারা এত সুন্দর করে বানিয়েছে যে মনে হয় সেগুলো এক একটি দর্শনীয় স্থান । যেমন Qatar Maternity Hospital এর সামনে তারা “The Miraculous Journey” নামে ১৪ টা sculptures এর একটি সিরিজ বানিয়ে রেখেছে যেটা দেখতে শত শত মানুষ ভীর করে।  আমার আপন ছোট খালু Lung Cancer এ ভুগছেন। তিনি বিগত ২ বছর যাবত কাতারে চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং আল্লাহর অশেষ রহমতে অনেক ভালো আছেন। কাতার সরকার সেখানকার অধিবাসীদের চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিভিন্ন বাভে আর্থিক সাহায্য করে থাকেন। তাছাড়া সেখানের চিকিতসাকগন অনেক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। কাতারের চিকিতসাকদের বেতন এবং LifeStyle অনেক উন্নত । তাই চাকরী পেতেও অনেক বেশি Qualified হতে হয় । যেমন সেখানের লাইসেন্স পরীক্ষা দেয়ার আগে USMLE CK 2 পাশ করা থাকতে হয়।

PIC 20- DOHA Sea Port

PIC 21- Place Vendôme Mall Qatar

মুসলিম দেশ হিসেবে কাতার অবশ্যয়ই তাদের দেশে মাসজিদের দিকে বিশেষ ভাবে খেয়াল রেখেছে। বলা বাহুল্ল যে কাতার এর মেট্রোরেল, শপিংমল থেকে সুরু করে হাই ওয়েতে ও নামাজের সু বেবস্থা রাখা হয়েছে। যে গুলো দেখতেও অসাধারন। কিন্তু তার পর ও পুরো দেশ জুড়ে রয়েছে অসাধারন অনেক মাসজিদ । আমার সুযোগ হয়েছে ওদের জাতীয় মাসজিদ সহ আরও অনেক মাসজিদে নামাজ আদায় করার । তাছাড়া কাতার এ রয়েছে অনেক সুন্দর সুন্দর যাদুঘর যেখানে তারা ইসলামিক ঐতিহ্যের বিভিন্ন নিদর্শন সাজিয়ে রেখেছে । কাতার এ শিক্ষা বেবস্থাও অনেক উন্নাত। এখানে “Education City” রয়েছে যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন নামি দামি বিশ্ববিদ্যালয় এর শাখা রয়েছে। 

PIC 22- Qatar National Mosque

PIC 23- Hamad international airport

যেইদিন প্রথম টিকিট কাটি সে দিন থেকে সবসময় মনে হত কবে যাবো । যাবার পর দেখতে দেখতে কবে যে ১৫টা দিন পার হয়ে গেলো, টের ও পেলাম না ।  বিশ্বকাপ শেষ, শেষ এর সকল উত্তেজনা, এখন দিন গুলো সুধুই স্মৃতি । তবে ১৫ দিনের প্রতিটি দিনই আমি সর্বোচ্চ আনন্দ করার চেষ্টা করেছি । ভোর সকাল থেকে মাঝরাত পর্যন্ত চেষ্টা করেছি কাতার এর সব দর্শনীয় স্থান ঘুরে বেড়াতে । নতুন নতুন মানুষের সাথে মিশতে । নতুন কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করতে । এবং আমি মনে করি আমি সফল হয়েছি । কাতার থেকে ফেরার পথে খুব মন খারাপ হলেও মনে মনে আমি সিধান্ত নেই যে আবার আসব এখানে খুব সিগ্রই । মুসলিম দেশ হিসেবে কাতার  বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছে এরকম একটি সফল বিশ্বকাপ আয়োজন করে । এমন একটি ইতিহাসের সাক্ষী হতে পারায় আমি আল্লাহপাক কে অশেষ ধন্যবাদ ও সুক্রিয়া জানাই । ইনশাল্লাহ পরবর্তী ২০২৬ শালের বিশ্বকাপ ও দেখতে যাবো এবং আমার বিশ্বাস যে ২০২৬ সালে আমার দলই বিশ্বকাপ জিতবে।